28 C
Kolkata

‘বর্তমান কলকাতার বুকে যেন এক অভিশাপ আদিগঙ্গা’ -সৌগত দত্ত , রাজনৈতিক বিশ্লেষক

সৌগত দত্ত , রাজনৈতিক বিশ্লেষক

আদিগঙ্গার মহিমার কথা শতকের পর শতক ধরে জনমানসে উজ্জ্বল ছিল । কারণ এই নদীর সাথে জড়িয়ে আছে বহু হিন্দু পুরান ও লোকসাহিত্যের স্মৃতি। একসময় শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু নীলাচল যাত্রার পথে এই আদিগঙ্গার তীরেই ভক্তদের সাথে কিছুদিন কাটিয়েছিলেন । আবার বিভিন্ন মঙ্গলকাব্যের সাহিত্যেও বার বার উল্লেখিত হয়েছিল আদিগঙ্গার কথা । আদিগঙ্গার পথ ধরেই কখোনো‌ মনসামঙ্গলে শোনা যায় চাঁদ সওদাগড়ের বাণিজ্যযাত্রার কাহিনী , তো কখোনো চন্ডীমঙ্গলে শোনা যায় ধনপতি সওদাগড়ের পুত্র শ্রীমন্ত সওদাগড়ের সিংহল যাত্রার কাহিনী। আজকের দিনে সেই আদিগঙ্গা সম্পূর্ণরূপে তার ইতিহাস -ঐতিহ্য ও সৌন্দর্যকে খুইয়ে কেবল পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের এক দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে । আর অন্যদিকে স্বাধীন ভারতের সূচনাকাল থেকে আজ পর্যন্ত একের পর রাজনৈতিক চক্রান্ত , অবৈধ নির্মাণকারী ও জমি মাফিয়াদের রমরমায় যেন প্রকাশ্যে দিবালোকে আদিগঙ্গার কফিনে শেষ পেরেক গুলি পোঁতা হচ্ছে । গত বেশ কিছু বছর ধরে আদিগঙ্গার সংস্কারের জন্য কাগজে- কলমে কলকাতা পুরসভা বা পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অনেকগুলো উদ্যোগের কথা শোনা যেতে পারে কিন্তু আদিগঙ্গার অবস্থার কোনো উন্নতি চোখে পরার মতো নয় ‌। বর্তমানে দক্ষিণ কলকাতার নিকাশি ব্যবস্থার সবই আদিগঙ্গার সাথে মিশেছে । পরিবেশ বিশারদদের মতে ,” আদিগঙ্গার রিভার বেডের উচ্চতা ৬-১০ ফুট। অনেকদিন পলি না কাটার ফলে জলধারণ ক্ষমতা অনেক হ্রাস পেয়েছে । এবার বর্ষাকালে অতিবর্ষনে আদিগঙ্গা যখন ভর্তি হয়ে যায় তখন আদিগঙ্গার সাথে যুক্ত দক্ষিণ কলকাতার কোনো নিকাশি ব্যবস্থার মাধ্যমেই জল বেরোতে পারে না , যার কারণে এখন যেরকম কালিঘাট , চেতলাসহ দক্ষিণ কলকাতার অধিকাংশ এলাকাগুলি প্লাবিত হচ্ছে সেরকম প্রায় প্রতি বর্ষাকালেই হয় ।” এরকম পরিস্থিতিতে জলদূষণ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায় । আদি গঙ্গার জল এইসময় ভূগর্ভস্থ জলের পাইপলাইনের সাথে মিশে যায় , ঠিক যেমনভাবে এর আগেও বহুবার দূষিত পানীয় জলের অভিজ্ঞতা ভবানীপুরবাসী অনেকবার পেয়েছে । তাই বলতে হয় , সেই আদি কলকাতার গৌরব‌ সেই আদিগঙ্গাটি আজ আধুনিক কলকাতার এক অভিষাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ‘The Third Pole’ নামক এক জনৈক সংবাদমাধ্যমের পোর্টালে ২০১৬ সালে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায় যে , জাতীয় গঙ্গা অববাহিকা প্রকল্পের ( National Ganga River Basin Project ) আওতায় সরকার আদি গঙ্গা দূষণ নির্মূলের জন্য একটি উপপ্রকল্পের পরিকল্পনা করেছিল , সেটি বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় কলকাতা পৌরসভা কর্পোরেশনের বাস্তবায়ন করার কথা ছিল, কিন্তু তখনও প্রকল্পটি নাকি সময়সীমার থেকে অনেক পিছিয়ে ছিল । তারপর ২০২০ সালে আদিগঙ্গাকে পুনরুদ্ধার করতে রাজ্য সরকার , কলকাতা পৌরসভা এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদকে নির্দেশ দিয়েছিল জাতীয় পরিবেশ আদালত এবং শুধু পুনরুদ্ধার নয় , দখলদারদের উচ্ছেদ করে পুনর্বাসন এবং পূরোনো মানচিত্র ধরে অ্যাকশন প্ল্যান তৈরিরও নির্দেশ দিয়েছিল । বর্তমান সময়ে আদিগঙ্গার বুকে জমি দখল এবং অপরিকল্পিত ও অবৈধ নির্মাণকাজই বর্ষার সময়ে আদিগঙ্গার কারণে কলকাতার মানুষের ভোগান্তির প্রধান কারণ । কিন্তু আমাদের সবথেকে রাজ্যে তো সবথেকে বড়ো প্রহসনের বিষয় হল , বর্তমান‌ তৃণমূল শাসকদেলের অধিকাংশ নেতারাই এই দখলদারি ও অবৈধ নির্মাণকার্জের সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত থাকার খবর একাধিকবার প্রকাশ্যে এসেছে । চলতি বছরের গত ২০ সেপ্টেম্বর লকগেট পরিদর্শনে এসে কলকাতা পুরসভার আধিকারিক তারক সিংহ মহাশয় ‘টালির নালা ‘ অর্থাৎ এই আদিগঙ্গা প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে সংবাদমাধ্যমের সামনে স্পষ্টভাবে জানিয়েই দেন , ” টানা বৃষ্টি চললে দুর্ভোগ হবে … কিচ্ছু করার নেই ।” এদিকে বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকারের ‘ নমামী গঙ্গে ‘ প্রকল্পের আওতায় আসার অনুমোদন পেয়েছে আদিগঙ্গা । কিন্তু কেন্দ্রীয় প্রকল্পে আমাদের রাজ্যের মাননীয়ার সরকারের অনীহা ও অসহযোগিতা দিনের পর দিন ভোগাচ্ছে কলকাতাবাসীকে ।

আরও পড়ুন:  BREAKING Duare Ration: দুয়ারে রেশন প্রকল্পকে অবৈধ ঘোষণা কলকাতা হাইকোর্টের
আরও পড়ুন:  BREAKING Duare Ration: দুয়ারে রেশন প্রকল্পকে অবৈধ ঘোষণা কলকাতা হাইকোর্টের

Related posts:

Featured article

%d bloggers like this: