25 C
Kolkata

Netaji : প্রথা ভেঙে দেবী দুর্গার আরাধনা করেছিলেন সুভাষচন্দ্র

নিজস্ব সংবাদদাতা : ১৯২৬ সাল। ব্রিটিশ শাসনে পরাধীন ভারত। পরাধীনতার শৃঙ্খল মোছাতে ইংরেজ শক্তির বিরুদ্ধে স্বাধীনতার লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছে দেশের শত শত তরুণ। দেশমাতৃকাকে শৃঙ্খলমুক্ত করারই তাঁদের জীবনের লক্ষ্য। ব্রিটিশ শক্তিকে পর্যদস্ত করতে সক্রিয় বিপ্লবীরা। বিভিন্ন গোপন আস্তানায় চলছে ব্রিটিশ বিরোধী কাজকর্ম। সেইসময় ব্রিটিশের চোখে ধুলো দিয়ে জমায়েতের একটি গোপন ডেরার খোঁজ করছিলেন বিপ্লবীরা। কলকাতাতেও বিপ্লবীদের জোটবদ্ধ করতে একটা কনভেনশনের দরকার ছিল। কিন্তু ব্রিটিশদের ফাঁকি দিয়ে তেমন স্থানের খোঁজ মিলল না। মুসকিল আসান করতে আসরে নামলেন সুভাষচন্দ্র বসু। ফন্দি আঁটলেন নেতাজি। সিমলা অঞ্চলের মহেন্দ্র গোস্বামী লেনেই ছিল বিপ্লবী অতীন্দ্রনাথ বসুর বাড়ি। তাঁর বাড়িতে মাঝেমধ্যেই থাকতেন সুভাষচন্দ্র বসু। নেতাজির নির্দেশে অনুগামী বিপ্লবী অতীন বসু  আয়োজন করলেন দুর্গাপুজোর। বাড়ি বাড়ি ঘুরে আদায় হল চাঁদা। হোগলাপাতার বেড়া দিয়ে তৈরি হল সিমলা ব্যায়াম সমিতির প্যান্ডেল। ১৯২৬ সালে কলকাতায় পুজো শুরু হল সিমলা ব্যায়াম সমিতির। দেশমাতৃকার শৃঙ্খল মোচনের শক্তি সঞ্চয়ে শুরু হল মাতৃ আরাধনা। আর সহজেই পাকা হয়ে গেল স্বাধীনতা সংগ্রামীদের জমায়েতের স্থানটিও। সিমলা ব্যায়ম সমিতির পুজো প্রাঙ্গণে সবার সঙ্গে পাত পেড়ে প্রসাদ খেতেন সুভাষচন্দ্র বসু, রাজেন দেবদের মতো বিশিষ্টরা।

সিমলা ব্যায়ম সমিতির পুজোয় সবার সঙ্গে বসে প্রসাদ গ্রহণ করছেন নেতাজি

একবার বিপ্লবীদের জমায়েত টের পেয়ে পুজো বন্ধ করে দেয় ব্রিটিশ সরকার। বেশিদিন নয়, দু’বছর পরই আবার চালু হয় পুজো। একচালা দুর্গামূর্তি থেকে পাঁচটি চালচিত্রে ভাঙা দেবীমূর্তির প্রচলনও এখান থেকেই। দেবীমূর্তির চালচিত্র বদলে দেওয়ায় রক্ষণশীলদের ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে পুজো কমিটি। সমালোচনা থামাতে ১৯৩৯ সালে সিমলা ব্যায়ম সমিতির সভাপতি পদে থাকা সুভাষচন্দ্র বসুর হাত দিয়েই পুজোর উদ্বোধন হয় এবং সুভাষচন্দ্রের উপস্থিতিতে দেবীর বোধন আরম্ভ হয়। সিমলা ব্যায়াম সমিতির দুর্গাপুজোর পাশপাশি কলকাতার বাগবাজার সর্বজনীন দুর্গোৎসবের সঙ্গেও জড়িয়ে রয়েছে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর নাম।

কোদালিয়ায় নেতাজির বাড়ির দুর্গা প্রতিমা

১৯২৩ সালে ব্রিটিশ পুলিশদের হাতে বন্দি হন সুভাষ। পরের বছর তাঁকে পাঠিয়ে দেওয়া হল বহরমপুর জেলে। সেখানে ৭নম্বর ঘরটি হল রাজবন্দি সুভাষচন্দ্র বসুর ঠিকানা। জেলে বন্দি থাকার সময় সুভাষ দুর্গাপুজো করবেন বলে জেদ ধরেন। তাঁর জেদের কাছে নতিস্বীকার করেন ব্রিটিশ শক্তি। জেল কর্তৃপক্ষ দুর্গাপুজোর ব্যবস্থা করেন। জেলের ভিতরেই মহাসমারোহে হয় দুর্গা আরাধনা। তবে বহরমপুর জেলে সুভাষচন্দ্র দুর্গাপুজো করেছিলেন না সরস্বতী পুজো, তা নিয়ে মতবিরোধ আছে । তবে ওই সময়ে বহরমপুর জেলে পুজো অনুষ্ঠিত হয়। এবং সেই পুজো উপলক্ষে জেলে নিয়মের তেমন কড়াকড়ি না থাকায় সেইসময় জেলেবন্দি সুভাষের সঙ্গে দেখা করতে আসেন অনেকেই।

আরও পড়ুন:  Suhana Khan: ওজন ঝড়িয়ে উন্মুক্ত পাখি হয়ে উঠলেন সুহানা

সুভাষচন্দ্র বসুও তেমনটাই চেয়েছিলেন। যার ফলেই পুজো নিয়ে এতটা জেদ ধরেছিলেন তিনি। কারাবন্দি অবস্থায়ও মায়ের আরাধনা করতেন সুভাষচন্দ্র বসু।  সুরেন্দ্রমোহন ঘোষ সুভাষচন্দ্রের সঙ্গে বার্মার মান্দালয়ে কারারুদ্ধ ছিলেন। সুরেন্দ্রমোহন বলেছেন, যে সুভাষচন্দ্র মান্দালয়ে প্রতিদিন মা কালীর ধ্যান করতেন।  বাগবাজার সার্বজনীনের পুজোর সূচনা ঘটে ১৯১৯ সালে৷ এই পুজো শুরু হয়েছিলো স্থানীয় নেবুবাগান লেন ও বাগবাজার স্ট্রিটের মোড়ে ৫৫ নম্বর বাগবাজার স্ট্রিটে। তখন এই বারোয়ারী পূজার নাম ছিল ‘নেবুবাগান বারোয়ারি দুর্গা পুজো’। ৯৩০ সালে বিখ্যাত আইনজীবী তথা তৎকালীন কলকাতা পুরসভার কর্মচারী দুর্গাচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রচেষ্টায় বাগবাজার সার্বজনীন দুর্গাপূজাটি বর্তমান চেহারা পায়। নাম হয় ‘বাগবাজার সার্বজনীন দুর্গোৎসব ও প্রদর্শনী’। তাঁরই উদ্যোগে বাগবাজার সার্বজনীন দুর্গাপুজো উঠে আসে কর্পোরেশনের মাঠে। তৎকালীন মেয়র সুভাষচন্দ্র বসু সানন্দে এই অনুমতি দেন। শুধু পুরসভার মাঠ ব্য‌বহার করতে দিয়েছিলেন তাই নয়, বাগবাজারের এই পুজোয় সেইসময় পাঁচশ টাকা চাঁদা দিয়েছিলেন সুভাষচন্দ্র। ১৯৩৬ সালে এই পুজোর সভাপতি হয়েছিলেন সুভাষচন্দ্র বসু।

কলকাতার ঐতিহ্যবাহী কুমোরটুলি সার্বজনীন দুর্গোৎসব কমিটির সঙ্গে নেতাজির জড়িয়ে পড়ার ঘটনাটি বাঙালির দুর্গাপূজার ইতিহাসে এক অন্য মাত্রা এনে দিয়েছিল। এই পুজোর মধ্য দিয়ে এক নতুন প্রথাকে আহ্বান করেছিলেন সুভাষচন্দ্র। কুমোরটুলির শিল্পীরা মিলেই এই পুজো শুরু করেন৷ পুজোর প্রথম সভাপতি ছিলেন স্যার হরিশংকর পাল৷ সাতবছর পর কমিটির পক্ষ থেকে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে পুজোর দায়িত্ব নেওয়ার জন্য অনুরোধ করা হয়৷ কিন্তু সুভাষচন্দ্র অনুরোধ প্রত্যাখান করে সাফ জানালেন,  যেখানে ইংরেজের তাঁবেদারি হয় সেখানে তিনি কোনওভাবেই জড়াবেন না৷ স্যার হরিশংকর পালের দিকেই যে তাঁর এই ইঙ্গিত ছিল সেটা বুঝতে কারও বাকি ছিল না৷ হরিশংকর পাল নিজেও বুঝেছিলেন নেতাজির কটাক্ষ৷ কমিটির সভাপতির পদ থেকে সরে গিয়েছিলেন তিনি৷ সেইবছরই অর্থাৎ ১৯৩৮ সালে কুমোরটুলি সার্বজনীনের নতুন সভাপতি হলেন সুভাষচন্দ্র বসু৷ কিন্তু পঞ্চমীর দিনই ঘটে গেল মহাবিপত্তি৷

মণ্ডপে চলে এসেছে একচালার ঠাকুর৷ হঠাৎ বিকেলে মন্ডপে আগুন লেগে যায় ৷ মণ্ডপ, প্রতিমা, সব পুড়ে ছাই৷ অথচ পরের দিনই বোধন ৷ নেতাজি গেলেন শিল্পী গোপেশ্বর পালের কাছে ৷ অনুরোধ করে বললেন, যেভাবেই হোক এক রাতের মধ্যে ঠাকুর তৈরি করে দিতেই হবে ৷ সেকথা শুনে তো শিল্পী ৷ নেতাজির এই অনুরোধ রক্ষা যে অসম্ভব৷ মুহূর্তে সুভাষচন্দ্র সিদ্ধান্ত নিলেন আলাদা আলাদা করে প্রতিমা গড়া হবে৷ জি পাল দুর্গা প্রতিমা গড়লেন ৷ আর অন্যান্য শিল্পীরা গড়লেন লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক, গণেশ ৷ এক রাতের মধ্যেই সব প্রতিমা গড়ার কাজ সম্পন্ন হল ৷ ষষ্ঠীর দিন কলকাতার কুমোরটুলি সার্বজনীনের মণ্ডপে এল পাঁচ চালায় আলাদা দুর্গা, সরস্বতী, লক্ষ্মী, গণেশ ও কার্তিক ৷ এখানেই শেষ নয়, একেই তো পাঁচ চালা আর তারওপর দেবীর জমকালো সাজসজ্জা৷ এইসব দেখে বেঁকে বসলেন পুরোহিতরা ৷

আরও পড়ুন:  Croatia vs Belgium : বিশ্বকাপের প্রি কোয়ার্টারে ক্রোয়েশিয়া, বেলজিয়ামের বিদায়, খলনায়ক লুকাকু

অবশেষ অনেক আলোচনার পর পুজোর পুরোহিত৷ তবে এটাই শেষ প্রথা ভাঙা ছিল না৷ পরের বছর নেতাজি পুজো কমিটির সভাপতি থাকাকালীন কুমোরটুলি সার্বজনীনের দেবী দুর্গার গায়ে উঠেছিল সত্যিকারের বাঘের ছাল ৷  কলকাতার একাধিক বনেদি বাড়ির পুজোতে পদধূলি দিয়েছিলেন সুভাষচন্দ্র বসু। ১৮৭৭ সালে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী প্রয়াত প্রতাপ চন্দ্র চন্দ্রের বাড়িতে পুজোর সূচনা করেন গণেশ চন্দ্র চন্দ্র। এই গণেশ চন্দ্র চন্দ্রের নামেই গণেশ চন্দ্র অ্যাভিনিউ। এই বাড়িতে দুর্গাপুজো দেখতে আসতেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের মতো বিশিষ্টরা।

কোদালিয়ার সেই বাড়ি

সোনারপুর কোদালিয়ায় নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুর ঠাকুরদা হরনাথ বোসের বাড়ির দুর্গাপূজা প্রায় ৩০০ বছরের পুরনো। তখনকার দিনে সোনারপুর কোদালিয়া এলাকায় দুর্গাপূজা বলতে এই বসু পরিবারের পুজোকেই বুঝত। আজও এই পুজোয় বসু পরিবার অংশগ্রহণ করে। সেইসময় অষ্টমীর দিন সকাল থেকে সন্ধিপূজা পর্যন্ত এই বাড়ির ঠাকুরদালানে সময় কাটাতেন সুভাষচন্দ্র।  অষ্টমীর অঞ্জলি থেকে সন্ধ্যা আরতি পর্যন্ত, সর্বক্ষণ তিনি বসু বাড়ির ঠাকুরদালানে থাকতেন। রাত্রে তিনি কোদালিয়ায় তাঁর নিজের পৈত্রিক ভবনটি রয়েছে সেখানে রাত্রিবাস করতেন।

এখানে সুভাষচন্দ্রের সঙ্গে দেখা করতে আসতেন স্বাধীনতা সংগ্রামীরাও। যাঁদের ওপরে ব্রিটিশ সরকার ও পুলিশের বিশেষ নজর ছিল, তাঁরা গোপনে আসতেন রাতেরবেলায়। সুভাষচন্দ্র তাঁদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন নিজের ঘরে। ভোরের আলো ফোটার আগেই তাঁরা আবার কোদালিয়ার বসু বাড়ি ত্যাগ করতেন। মা প্রভাবতী বসুর প্রভাবে রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দর প্রতি ছেলেবেলা থেকেই আকৃষ্ট হন সুভাষ। পরবর্তী সময়ে নেতাজি সুভাষচন্দ্র হয়ে ওঠেন শক্তির উপাসক।

Featured article

%d bloggers like this: