25 C
Kolkata

Netaji:’আমি তোমাকে দেশনায়কের পদে বরণ করি’

নিজস্ব সংবাদদাতা : সুভাষচন্দ্র বসু তখন ছাত্রনেতা। প্রেসিডেন্সি কলেজে আই.এ পড়েন। কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে তিনি চলে গেলেন শান্তিনিকেতন। সেই রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তরুণ সুভাষের প্রথম দেখা। রবীন্দ্রনাথ তাঁদের আশীর্বাদ করে গ্রামে গ্রামে সংগঠন গড়ে পল্লি সমাজের সেবা করার পরামর্শ দিলেন। প্রস্তাব মনমতো হল না সুভাষের। তার থেকে অনেক বেশি সুভাষকে অনুপ্রাণিত করল ‘আমার জীবনে লভিয়া জনম জাগোরে সকল দেশ’।

পরে রবীন্দ্রনাথের আমন্ত্রণে ১৯৩৮ সালের ৮ ডিসেম্বর শ্রীনিকেতনের শিল্পভবনের দ্বারোদ্ঘাটন করতে গিয়ে নিজেই সে কথা স্বীকার করেছিলেন সুভাষচন্দ্র। বিলেত থেকে আইসিএস হয়ে দেশে ফেরার পর রবীন্দ্রনাথের পরামর্শ মতোই গান্ধীজির উপদেশ নিয়েছিলেন সুভাষ। মহাত্মা গান্ধির উপদেশেই চিত্তরঞ্জন দাশের সঙ্গে দেখা করে নিজের রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন সুভাষচন্দ্র।

দেশমাতৃকাকে শৃঙ্খলমুক্ত করতে তাঁরা দুইজনেই ছিলেন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। একজন প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন কলম। আর অন্যজন অসি। এই অসি আর মসির ফারাকটুকু ছাড়া কোথাও যেন মিলে গিয়েছিল দুই মহামানবের জীবনপথ। যত সময় গড়িয়েছে রবীন্দ্রনাথের আদর্শ-বাণী শক্তি ও অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে সুভাষচন্দ্রকে। জননায়ককে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন বিশ্বকবি। 

১৯২৪ সুভাষ কারাবন্দি সুভাষ মন্ত্রমুগ্ধের মতো রবি ঠাকুরের গান-কবিতা জপ করতেন। ১৯২৭ সালে সাইমন কমিশন বয়কটের সূত্রে সুভাষচন্দ্রের সঙ্গে গান্ধিজির মতপার্থক্য শুরু হয়। সুভাষ তখন তরুণ সমাজের যুব কণ্ঠ। সেইসময় থেকেই রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সুভাষচন্দ্রের সম্পর্ক প্রগাঢ় হতে শুরু করে। কিন্তু ১৯২৮ সালে ব্রাহ্ম-পরিচালিত সিটি কলেজের ছাত্রাবাসে সরস্বতী পুজো ঘিরে একটি বিতর্ক সৃষ্টি হয়। সেখানে সুভাষচন্দ্রের কীর্তিকে তীব্র ভর্ৎসনা করেন রবীন্দ্রনাথ। কিন্তু পরবর্তী সময়ে দিন যত এগিয়েছে ততই স্নেহ ও প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন রবীন্দ্রনাথ ও সুভাষচন্দ্র।

১৯৩১ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর বিপ্লবীদের ওপর ব্রিটিশ শক্তির নির্বিচারে গুলি চালানোর ঘটনার প্রতিবাদে মনুমেন্টে এক প্রতিবাদী সভার আয়োজন করেন সুভাষ। অসুস্থ শরীর নিয়েও শুধু সুভাষচন্দ্র বসুর অনুরোধে সেই সভায় উপস্থিত হন রবীন্দ্রনাথ। ১৯৩৬ সালের ১১ এপিল, রোম, ভিয়েনা, আয়ারল্যান্ড সহ  জার্মানবাসীর সংবর্ধনা গ্রহণ করে দেশে ফিরতেই সুভাষচন্দ্রকে গ্রেফতার করল ইংরেজ পুলিশ। এই অন্যায় গ্রেফতারির প্রতিবাদে ১৯৩৬ সালের ১০ মে সুভাষচন্দ্রের মুক্তির দাবিতে সুভাষ দিবস নামে আন্দোলনে নামল গোটা দেশ। প্রতিবাদে গর্জে উঠে কলম ধরলেন রবীন্দ্রনাথ।

আরও পড়ুন:  Bombing Incident: আসন্ন পঞ্চায়েত নির্বাচন, বোমাবাজি নরেন্দ্রপুরে

আবার সবক্ষেত্রে যে এই দুই মবামানবের মত মিলেছে, তাও নয়। বাংলার বিভিন্ন জেলে থাকার সময় সুভাষচন্দ্রের স্বাস্থ্যহানি হয়। সেইসময় বিদেশে যাওয়ার অনুমতি পেয়ে রবীন্দ্রনাথের কাছে একটি পরিচয়পত্র চেয়েছিলেন সুভাষচন্দ্র। কিন্তু কবির দেওয়া সংক্ষিপ্ত পরিচয়পত্র ব্যাথিত করেছিল দেশনেতাকে। সুভাষ নিজের লেখা সেই বিখ্যাত বই দ্য ইন্ডিয়ান স্ট্রাগল-এর ভূমিকা লেখার জন্য রবীন্দ্রনাথকে চিঠিতে অনুরোধ করেছিলেন বার্নড শ ও এইচ জি ওয়েলসের সঙ্গে কথা বলতে। সুভাষের অনুরোধ প্রত্যাখান করেছিলেন বিশ্বকবি।

আবার সুভেচন্দ্র দেশে ফেরার পর যখন ব্রিটিশ সরকার ‘ইন্ডিয়ান স্ট্রাগল’ বইটির টাইপ করা কপি বাজেয়াপ্ত করে। সেসময় সুভাষের বিরুদ্ধে ব্রিটিশের কঠোর দমননীতির প্রতিবাদে গর্জে উঠেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

১৯৩৯ সালের জানুয়ারি মাসে রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনের আম্রকুঞ্জে কংগ্রেসের সভাপতি সেই প্রিয় সুভাষচন্দ্রকে সম্বর্ধনা জানান। পরবর্তী সময়ে কংগ্রেসের সভাপতি পদের জন্য জটিলতা দেখা দিলে, তা দ্রুত সমাধানের জন্য গান্ধীজিকে চিঠি লেখেন রবীন্দ্রনাথ। সুভাষচন্দ্র কংগ্রেস সভাপতির পদ পরিত্যাগ করলে ব্যাথিত হয়েছিলেন কবি। কিন্তু আঘাত সরিয়ে সুভাষচন্দ্রকে অভিনন্দন জানিয়ে কবি লিখলেন, ‘অত্যন্ত বিরক্তিকর অবস্থার মধ্যে পড়িয়াও তুমি যে ধৈর্য ও মর্যাদার পরিচয় দিয়েছো তাতেই তোমার নেতৃত্বের প্রতি আমার শ্রদ্ধা ও বিশ্বাসের উদ্রেক হয়েছে’।

সেই বছরই নিজের লেখা নাটক ‘তাসের দেশ’ নতুনভাবে পরিমার্জিত করেন কবি। দ্বিতীয় সংস্করণে গ্রন্থটি সুভাষচন্দ্রকে উৎসর্গ করেন রবীন্দ্রনাথ। ফরওয়ার্ড ব্লকের প্রতিষ্ঠার পর ১৯৩৯ সালের মে মাসে কবি লিখলেন, ‘সুভাষচন্দ্র, আমি বাংলাদেশের হয়ে তোমাকে দেশনায়কের পদে বরণ করি’। ১৯৩৯ সালের অগস্ট মাসে কবিগুরু পরিকল্পনায় একটি ঐতিহাসিক ভবন গড়ার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সদনটির নামকরণ করেন ‘মহাজাতি সদন’ । রবীন্দ্রনাথের দর্শনে অনুপ্রাণিত হয়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার প্রচেষ্টাকে নিজের রাজনৈতিক জীবনের মূলমন্ত্র করেছিলেন সুভাষচন্দ্র।

আরও পড়ুন:  Daily Horoscope 03 December, 2022: কেমন যাবে আজকের দিন, আপনার রাশিফল জেনে নিন…..

কবির সঙ্গে দেশনায়কের শেষ সাক্ষাৎকারটি হয়েছিল ১৯৪০ সালের ২ জুলাই, মঙ্গলবার জোড়াসাঁকোর বাড়িতে। এই সাক্ষাৎকারের ঠিক পরেই বেলা আড়াইটে নাগাদ এলগিন রোডের বাড়ি থেকে সুভাষচন্দ্রকে গ্রেফতার করে প্রেসিডেন্সি জেলে বন্দি করা হয়। পরের দিন, অর্থাৎ ৩ জুলাই শান্তিনিকেতন থেকে দেশনেতার প্রতি সস্নেহ শুভকামনা জ্ঞাপন করে একটি প্রেস বিবৃতিতে রবীন্দ্রনাথ বলেন। ‘আমি সুভাষকে কখনো ভর্ৎসনা করিনি তা নয়, করেছি তার কারণ তাকে স্নেহ করি। ব্যক্তিগতভাবে সুভাষকে আমি স্নেহ করি। তিনি দেশকে অন্তরের সঙ্গে ভালোবাসেন এবং দেশবিদেশের রাষ্ট্রনীতি তিনি চর্চা করেছেন সেইজন্যে তাঁর কাছে আমি আশা করি এবং দাবী করি তিনিও দেশকে তার বর্তমান দুর্গতির জটিলতা থেকে উদ্ধার করবেন’। 

চলার পথে সুভাষের সমর্থনে বারবার এগিয়ে এসেছেন, সমব্যথী হয়েছেন, প্রেরণা যুগিয়েছেন এবং আনন্দিত হয়ে গর্ব প্রকাশ করেছেন রবীন্দ্রনাথ। বিশ্বকবির জনগনমন গানটিকেও প্রথমবার জাতীয় সংগীতের মর্যাদা দিয়েছিলেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুই। বিদায়বেলাটিও মিলিয়ে দেয় এই দুই মহামানবকে। দুই ভারত পূজারী, মানবতার পূজারীর একইসঙ্গে বিদায় নিলেন। ১৯৪১ সালের ৭ অগস্ট অমৃতলোকে যাত্রা করলেন রবীন্দ্রনাথ। ওই বছরই ভারত তথা মানবের মঙ্গল সাধনায় লোক চক্ষুর আড়ালে চিরকালের মতো অন্তর্নিহিত হলেন মহান দেশনায়ক নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু।

Featured article

%d bloggers like this: