24 C
Kolkata

দক্ষিণেশ্বরের আদ্যাপীঠ মন্দির, যার সঙ্গে জুড়ে আছে নানা অলৌকিক কাহিনি

নিজস্ব প্রতিবেদন: বাংলার অতি জনপ্রিয় তীর্থস্থানগুলোর অন্যতম দক্ষিণেশ্বর। এখানে রয়েছে শ্রীরামকৃষ্ণের লীলাক্ষেত্র ভবতারিণী মন্দির। আর, তার কিছুদূরেই দেবী আদ্যার পীঠস্থান আদ্যাপীঠ। যা প্রসিদ্ধ কালীমন্দিরগুলোর মধ্যে অন্যতম। দেবী কালীই এখানে আদ্যাশক্তি মহামায়া রূপে পূজিতা হন। এই মন্দিরে ওঙ্কারের মধ্যে রয়েছে দেবী আদ্যার মূর্তি। তাঁর নীচে শ্রীরামকৃষ্ণের ধ্যানরত মূর্তি। আর, দেবী আদ্যার ওপরে রাধাকৃষ্ণের মূর্তি।

দক্ষিণেশ্বর লাগোয়া এই কালীক্ষেত্র নিয়ে রয়েছে নানা ইতিহাস। এই মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা অন্নদাঠাকুর ছিলেন বাংলাদেশের চট্টগ্রামের বাসিন্দা। পৈতৃক নাম অন্নদাচরণ ভট্টাচার্য। মায়ের নাম তিলোত্তমা দেবী। বাবা অভয়চরণ ভট্টাচার্য। তিন সন্তানের মধ্যে মধ্যম ছিলেন অন্নদাচরণ। হতে চেয়েছিলেন আয়ুর্বেদ চিকিৎসক। চট্টগ্রাম থেকে কলকাতায় কবিরাজি পড়তে এসেছিলেন অন্নদাচরণ। সময়টা ছিল বাংলার ১৩২১ সাল। থাকতেন কলকাতার আর্মহাস্ট স্ট্রিটে এক বন্ধুর বাড়িতে। সেখান থেকেই বৃত্তি নিয়ে পাশ করেছিলেন কবিরাজি। বন্ধুর বাবার সাহায্যে কবিরাজির ডিসপেনসারির জন্য দোকানও ভাড়া নিয়েছিলেন। এমন সময় রামকৃষ্ণদেব তাঁকে বলেছিলেন তোমার কবিরাজি ব্যবসা হবে না। ঠাকুর অন্নদাকে নির্দেশ দিয়েছিলেন ইডেন গার্ডেন্সের ঝিলে আদ্যা মা পড়ে আছেন। ওখান থেকে মাকে উঠিয়ে নিয়ে এসো।

অন্নদা ঠাকুর ঝিলে খোঁজাখুঁজি করতে ১৮ ইঞ্চি আদ্যা মায়ের কষ্টিপাথরের মূর্তি পান। সেদিন ছিল রামনবমী তিথি। রাতে মা তাঁকে দেখা দিয়ে বলেন, অন্নদা কাল বিজয়া দশমী। তুমি আমায় গঙ্গায় বিসর্জন দিও। এই কথা শুনে অন্নদা আঁতকে উঠে বলেন, আমি কি পুজোপাঠ করিনি বলে তিনি রাগ করে চলে যাচ্ছেন ? তখন মা বলেন, না তা নয়। আমি শুধু শাস্ত্র বিহিত মতে পুজো পেতে চাই তা নয়। মা খাও, মা পড়ো – এমন সহজ সরল প্রাণের ভাষায় যে ভক্ত নিজের ভোগ্যবস্তু এবং ব্যবহার্য বস্তু আমাকে নিবেদন করেন, সেটাই আমার পুজো। যদি কোনও ভক্ত আমার সামনে আদ্যাস্তোত্র পাঠ করে তাহলে আমি বিশেষ আনন্দিত হই। এরপর মা আদ্যাস্তোস্ত্র বলেন, আর অন্নদা ঠাকুর লিখে যান। সেই স্ত্রোত্রই এখন আদ্যাপীঠে পাঠ হয়। পরে দেবী আদ্যার স্বপ্নাদেশে বিজয়া দশমীতে মূর্তিটি বিসর্জন দেন মাঝগঙ্গায়। স্বপ্নাদেশ মতই মূর্তিটির ছবি তুলে রেখেছিলেন তিনি। তা থেকেই তৈরি হয়েছে বর্তমান আদ্যামূর্তি। বাংলার ১৩২৫ সালে শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁকে স্বপ্নে সন্ন্যাস দীক্ষাও দেন।

আরও পড়ুন:  Life Style Tips : ঘি খেয়ে আপনার গর্ভের সন্ত্রানকে ফর্সা করবেন যেভাবে

এই ঘটনার চার বছর পর ১৯১৮ সালে ঝুলন পূর্ণিমার রাতে রামকৃষ্ণদেব অন্নদা ঠাকুরকে হৃষিকেষ যেতে বলেন। সেখানে মন্দির তৈরির আদেশ দেন তিনি। রামকৃষ্ণদেব বলেছিলেন, সৃষ্টির পর পৃথিবীর বুকে এমন মন্দির হতে চলেছে যেখানে ঈশ্বরের প্রকট আবির্ভাব ঘটবে। তার মাহাত্ম্য এতটাই হবে যে মন্দির স্পর্শ করলেই ভক্তদের উদ্ধার মিলবে। রামকৃষ্ণ পরমহংসের শিষ্য অন্নদা ঠাকুরের হাত ধরেই দক্ষিণেশ্বরের অদূরেই তৈরি হয় এই আদ্যাপীঠ। কোনও শাক্ত পীঠ নয়। আদ্যাশক্তি মহামায়ার বিগ্রহেই ফুল-চন্দন পড়ে নিয়মিত। ভোগও হয়। তবে অন্য দিনের থেকে একটু আলাদা আয়োজন কালীপুজোর দিন। সেদিন মহাপুজোর আয়োজন হয় আদ্যা মন্দিরে। কার্তিক অমাবস্যার আঁধার কাটিয়ে, দীপাবলির আলোয় সেজে ওঠে গোটা আদ্যাপীঠ। আদ্যাশক্তি মহামায়া। দেবীর আরাধনায় তো নিজের জীবন উত্‍সর্গ করে ছিলেন রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব। দক্ষিণেশ্বরের কালীমন্দিরে ভবতারিণীর সংসারেই, গোটা জীবন কাটিয়ে দিয়েছিলেন কামারপুকুরের গদাধর চট্টোপাধ্যায়।

নির্দেশ ছিল, বারো বছরের মধ্যে মন্দির নির্মাণ সম্পূর্ণ হলেই মন্দিরে সাধারণের প্রবেশ অবাধ থাকবে। কিন্তু তা হয়নি। তাই নাট মন্দির থেকেই দর্শন করতে হয় দেবীকে। শীর্ষে রাধাকৃষ্ণ, তারপর আদ্যাশক্তি মহামায়া এবং দেবীর নীচে রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব। এভাবেই সাজানো মূল মন্দিরের কক্ষ। আদ্যাপীঠের ভোগেও রয়েছে বৈশিষ্ট্য। রাধাকৃষ্ণের জন্য সাড়ে ৩২সের চালে রান্না হয়। দেবী আদ্যার জন্য সাড়ে ২২ সের চাল বরাদ্দ রয়েছে। রামকৃষ্ণ পরহংসদেবের ভোগ রান্না হয় সাড়ে ১২ সের চালে। সেই ভোগ পঞ্চব্যঞ্জনে নিবেদন করা হয়। এর সঙ্গে পরমান্ন ভোগও থাকে। অন্নদা ঠাকুরের নির্দেশ ছিল, বৃহৎ ভোগ মন্দিরে যাবে না। মন্দিরের পাশে ভোগালয়ে তা সাজিয়ে দেওয়া হবে। সেখানেই নিবেদন করা হবে ভোগ। তিনি নির্দেশ দিয়েছিলেন কেবল পরমান্ন ভোগ যাবে দেবীর কাছে। আজও সেই নিয়ম মানা হয় আদ্যাপীঠে। রাতে হয় অমৃতভোগ। যা ঘি এবং উৎকৃষ্ট চাল দিয়ে তৈরি।

আরও পড়ুন:  Mythology : বিবাহিত হিন্দু নারীদের শাঁখা প্রচলন কি করে হল?

অন্নদা ঠাকুরই ঠিক করে গিয়েছিলেন, মন্দিরের আয় থেকে বালকের জন্য ব্রহ্মচর্যাশ্রম। বালিকাদের জন্য তৈরি হবে আর্য নারীর আদর্শ শিক্ষাদান কেন্দ্র। সংসারবিবাগী গৃহস্থের জন্য তৈরি হবে বাণপ্রস্থাশ্রম। আর সংক্রামক ব্যাধি নিবারণের চেষ্টা বা হাসপাতাল তৈরি করা হবে। বাংলার ১৩৩৫ সালে অন্নদা ঠাকুর পুরীতে প্রয়াত হন। কিন্তু, তাঁর ভক্ত ও শিষ্য ও ব্রহ্মচারীরা সেই নির্দেশ মানছেন অক্ষরে অক্ষরে। এখানকার অ্যাম্বুল্যান্সে তৈরি হয়েছে ভ্রাম্যমাণ চিকিৎসালয়। যেহুতু অন্নদাঠাকুর সংক্রামণ ব্যাধির চিকিৎসা করতে বলেছিলেন, তাই আদ্যাপীঠের অ্যাম্বুল্যান্সের গায়ে সংক্রামক ব্যাধির জন্য নয়, কথাটি আজও লেখা থাকে না।

Featured article

%d bloggers like this: