35 C
Kolkata

NEWAGE LIFE ANALYTICS: ‘কাজের লোক’ই এখন কাছের লোক

আমরা কজন এই জগতে আছি? না মানে এখানে থাকলেও সত্যি কি এখানেই আছি। নাকি বাস করছি অন্য কোথাও। ওই বারো চোদ্দ থেকে বাইশ তেইশ বছর। ছেলেমেয়েগুলো ভার্চুয়াল দুনিয়াতেই বন্দি হয়ে গেছে। করণাতে এই কাল্পনিক দুনিয়া যেন আরও গ্রাস করছে প্রত্যেককে। এখানে থেকেও যেন কেউ নেই। বর্তমান যুগে ছোট ছোট ছেলেমেয়েগুলোর সবচেয়ে কাছের ওই ‘কাজের লোক’গুলো। কর্পোরেট জীবন-যাপন তো। বাবা সকালে বেরিয়ে যাচ্ছে। বাচ্চা জানেও না। ফেরার সময়েরও ঠিক নেই। হয়তো বা ফিরবে না। সকালবেলা ওঠা। খাওয়া। স্কুল যাওয়া। “মা বাবা কখন আসবে?”- এইসব প্রশ্নের উত্তর তো ওরাই দেয়। ওরা মানে ওই কাজের লোকগুলো। এই ছুটে চলা জীবনে কারওর একবিন্দু দাঁড়ানোর সময় নেই। সকাল হলেই ট্রেনে বাসে গুঁতোগুঁতি। দিন দিন যেন এই রেসে নাম লেখানোর সংখ্যা আরও বাড়ছে। পড়ে ভালো থাকব বলে ‘আজ’কে খুব একটা মাথায় থাকছে না। আর ছোট ছোট ছেলে মেয়ে গুলো আঁকড়ে ধরেছে মোবাইলফোনগুলোকে। ফেসবুকে ছবি দিচ্ছে। ইনস্টাগ্রামের রিল বানাচ্ছে। শ’য়ে শ’য়ে লাইক পড়ছে। লাইকেই লুকিয়ে ভালোবাসা। কোনও দিন যদি লাইক না পড়ে, ভেঙে পড়ে মনগুলো। ভাবে, কেউ পাশে নেই। কান্নায় ভেঙে পড়ে ওরা। বাইরের জগতই হয়ে ওঠে সব। গোটা সমাজ দোষারোপ করে। ফোনে মুখ গুঁজে থাকে এই গেনারেশনটা। মাঝে মাঝে মা ফোন করে। বাবাও করে। “হোম ওয়ার্ক করছো তো?”, “আমার সোনা খাবার খেয়েছে?” পাশে বসে কথা বলার মানুষ নেই। চেনাশোনা কথা বলার মানুষ ভার্চুয়ালি। তারাও যদি রিপ্লাই না করে। লাইক না দেয়। চলবে কীকরে? একা লাগে তখন। আসলে তো একাই। ঠিক যেমন মেট্রোতে ঘাড়গুলো মোবাইলের দিকে ঝুঁকে থাকে। বাড়িতেও পরিস্থিতি দিনে দিনে তেমনই হচ্ছে। এরজন্য দায়ী কে? যুগান্তকারী এই সভ্যতা মানুষকে দৌড় করাতে শেখাচ্ছে। তবে মাঠগুলো ফাঁকা। খেলাধুলা হয় পাঁচ-ছয় ইঞ্চির স্ক্রিনে। এই অপ্রকৃত জগতটাই নাকি ধ্বংসের কারণ। ফোন হাতে নিয়েই সবটা গেল। এটা ছাড়া আছেই বা কী? আর কী নিয়েই বা বাঁচা যায়। সোশ্যাল মিডিয়াই এখন তৃপ্তি মেটাচ্ছে। কেউ শুধু আমায় গুরুত্ব দিক। এটাই নেশা হয়ে উঠেছে। প্রাণবন্ত হাসিগুলো এমোজিতে বন্দি। “দাদা খুচরো হবে?”- আর ক’জন বলে? এখন ওয়ালেটটাও ডিজিটাল। সময় বেঁচে যাচ্ছে তো। কিন্তু বাঁচিয়ে রাখা কি যাচ্ছে? অনেক অনেক প্রশ্ন। খবরে প্রায়ই দেখায়, গেম খেলতে না দিলে পড়ুয়ার আত্মহত্যা। ওইটুকু দুনিয়াটা কেড়ে নিলে ওরা বাঁচবে কীকরে? ভয় টিন এজারদের নিয়ে। এর আগে ব্লু হোয়েল গেম খেলে প্রাণ গেছিল এক যুবকের। মা বলেছিল, ‘খেলিস না’। হ্যাঁ বললেও, কথা রাখা গেল না। ওই ফাঁদেই পা দিল ছেলেটা। গেমের নির্দেশে শ্মশান থেকে ঘুরে এলো পায়ে হেঁটে। প্রমাণ করতে হবে, ভয় পাই না। এভাবেই নীল তিমি গ্রাস করল ছেলেটাকে। গেমের শেষ ধাপ ছিল ছাদ থেকে ঝাঁপ দেওয়া। ও গেমটা পুরোটা খেললো। শেষ হলো। নিজেও। ক’দিন আগেই ফেসবুকে ভিডিওটা ভাইরাল হয়েছিল। ছ’তলা বাড়ির ছাদ থেকে ঝাঁপ দিল ছেলেটা। ৫ মিনিট আগে ওর বোনটাও পড়েছিল। থেঁতলে গেল দু’জন। উঠলো না। ভাবল না বাড়ির কথা। কিসের এই পিছুটান ওদের তা কেউ বলতে পারে না। ওরাও না। শুধু খেলে বেড়ায় ব্যস্ত থাকবে বলে। ব্যস্ততার মাঝে কি একবারও মনে পড়ে না ছেলেমেয়েগুলোকে সময় দিই? শুধু বাবা মা নন, ব্যক্তিগত সম্পর্কের ক্ষেত্রেও একই সমস্যা। শুরুতে সবটা ভালোই ছিল। বাঁধনটা কেমন আলগা হতে থাকল। সময় হচ্ছে না দু’জনের। অনেক স্বপ্ন দেখেছিল একসাথে। এখন নতুন স্বপ্ন। দু’জনের আলাদা আলাদা। এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন। ছাড়া ছাড়া থাকার স্বপ্ন।
একবার ভেবে দেখলে হয় না। ছেলে মেয়েকে যদি সময় দেওয়া যায়। ওরাও হয়তো আস্তে আস্তে বাঁচার ইচ্ছে প্রকাশ করতে পারে। নিজেদের মধ্যে গুমরে মরবে না। ব্যস্ত জীবনে এক বিন্দু সময় বের করাই যায়। সবটাই ইচ্ছে। ভালোবাসার মানুষটাকে দিনের শেষে একবার ফোন করাই যায়। সময় আমাদের হাতে। তার ব্যবহারও। ভাবতে হবে। ওদের সময় দিতে হবে। সময়কে গুরুত্ব দিতে হবে। শুধু ছুটে বেরালে হবে না। সকলকে নিয়ে চলতে হবে। আমরা নিজেদের একা ভাবছি। আবার আমরাই কাউকে সময় দিতে নারাজ। বাচ্চাদের ফোন দিয়ে দিলে হবে না। ওদের খেলতে দিতে হবে। নিয়ে বেরোতে হবে। সময় দিতে হবে। দোলনা চড়াতে হবে। চকলেট কিনে দিতে হবে। পৃথিবীটা ওদের হাতে করে চেনান না। ওদের দুনিয়াটাও অন্যরকম হবে। তবেই তো ওরা ওদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ভালো জীবন দিতে পারবে। নেট দুনিয়ার পর্দা থেকে চোখ সরিয়ে বাস্তবে আনতে হবে। ভালোবাসার মানুষকে সময় দিতে হবে। দূর হবে মানসিক চিন্তা। সতঃস্ফূর্ত হবে বেঁচে থাকাটা। ব্লু হোয়েলে যেন আস্থা না রাখতে হয় ওদের। কাঁধটা আপনি বাড়িয়ে দিন। সব ঠিক হবে। আসলে আপনিও কিন্তু সময় না দিতে পারে, কারওর সময় না পেয়েই ফ্রাস্টেটেড। ভালোবাসলে তবেই তো ফেরত পাবেন। এই ছোট্ট জীবনে কোনও আক্ষেপ যেন না থাকে। ভালো রাখুন, ভালো থাকুন। একটি স্বার্থত্যাগ হয়তো করতে হবে। তবে ভালো থাকবেন। নিশ্চিন্তে।

আরও পড়ুন:  কলকাতার বুকে অমূল্য রতন

Featured article