29 C
Kolkata

Analytical: রসিকতা আর অসভ্যতার তফাৎ করা উচিৎ

শ্রাবণী পাল

স্থান কাল পাত্র- এই তিনটে বিচার করেই নাকি কথা বলতে হয়। সে কোনও গম্ভীর হোক বা কৌতুকের বিষয়। তবে এসব এখন অতীত, পাঁচ তলা মল পুরোটাই ভক্তকূলে ঠাসা। কে আর এতসব বিচার করতে যায়? না, সবাই আবার এই এক গোত্রে পড়ে না। তার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ হল অস্কারের মঞ্চ। গোটা ইন্টারনেট দুনিয়াকে স্তম্ভিত করে রেখেছিল একটি ভাইরাল ভিডিও। কী ছিল সেই ভিডিওতে? হলিউডের এক বিখ্যাত তারকা সপাটে চড় মারছেন সঞ্চালককে! তাও আবার যে সে না, সটাং অস্কারের মঞ্চে উঠে। সঞ্চালক ক্রিস রকের গালে থাপ্পড় মারেন অভিনেতা উইল স্মিথ। স্ত্রীর সম্পর্কে খোরাক করার জন্যই এই পদক্ষেপ নেন অভিনেতা। তার জায়গা থেকে দাঁড়িয়ে বিচার করা যায় এই ঘটনাকে। অভিনেত্রী জাডা পিঙ্কেটের রোগ নিয়ে এমন একটা মঞ্চে কথা বলতে যখন সঞ্চালক ছাড়েননি, তখন আর স্থান-কাল যাচাই করে লাভটা কি বলুন তো? একবার ঘটনাটা যদি মনে করিয়ে দেই, তাহলে সুবিধা হয়। উইল স্মিথের স্ত্রী জাডা পিঙ্কেট বিগত চার বছর একটি সমস্যায় ভুগছেন। যে কারণে তাঁর মাথার চুল খুবই কম। একটা সময়ে পুরোপুরি চুল কেটেও ফেলতে হয়েছিল। অ্যালোপেশিয়া অ্যারিয়াটা রোগে আক্রান্ত তিনি। সেসব কথা সঞ্চালক ভুলেই বসেছিলেন। রকের বলেন ‘Jada can’t wait for G.I. Jane 2″… আর ব্যাস! এই কথা শুনেই মঞ্চে উঠে এলেন স্মিথ। সপাটে চড় কষালেন রকের গালে। কিন্তু কী এই ‘G.I. Jane 2’? বছর পঁচিশ আগে একটি সিনেমা বেরিয়েছিল। অভিনয় করেছিলেন ডেমি মুর। এই ছবিটিতেও চুলের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আলোচনা হয়।

অস্কারের মতো মঞ্চে স্মিথ চড় মেরেছেন। শুধু কি এই চোর ওই সঞ্চালকের মুখেই মেরেছেন? সেইসব প্রত্যেকটি মানুষের গালের দাগ পড়েছে যারা এই ধরনের কাজকর্ম করে থাকেন। আমাদের দেশে এমন অনেকেই রয়েছেন যাদের কৌতুকতার কোনও সীমা থাকে না। এরা আবার খুব তাড়াতাড়ি পপুলারিটিও পায়। পাবে নাই বা কেন? এদের ভক্তকূলের সংখ্যাও যে রাতারাতি বাড়ে! বলা চলে ইন্টারনেটের যুগে এদের বাড়বাড়ন্ত নেহাতই কম নয়। এদের জন্য ইন্টারনেট একটা আস্কারা। বর্তমান যুগে এ তো আবার পয়সা রোজগারেরও পথ। কত মানুষ এভাবে অন্যের খোরাক বানিয়েই পেট চালাচ্ছে। বিভিন্ন বিখ্যাত পুরনো গানের মাঝে গালাগালি দিয়ে সেকি পপুলারিটি তার। সেই ব্যক্তির মজা ওড়াতে অন্য একজন আবার ওই পথই ফলো করছে। শুধু কি আর ইন্টারনেট? এই রাস্তাঘাটে পথ চলতে দেখুন না। কত এমন মানুষ আছে যার কথায় কথায় দুটো খিস্তি না দিলে বাক্য সম্পূর্ণ হয় না। যেমনটা ঠিক ব্যাকরণে পড়ানো হয় দাঁড়ি বা ফুলস্টপের মতো। ওটা ব্যবহার না করলেই বাক্যটা যেন ভুল। সত্যি কথা বলুন তো, এসব শুনে ভেতরে জ্বালা ধরে না? সমস্যা ঠিক কোন দিকে যাচ্ছে একবারও কি মাথায় আসেনি? শুধু খেয়াল করে মাথায় সীমাবদ্ধ রেখে লাভটা কি? প্রকাশ করতে পেরেছেন? প্রকাশ্যে কখনও বলতে পেরেছেন? অস্কার পুরস্কার হাত থেকে বেরিয়ে যাবে কি না সেসব ভাবেননি স্মিথ। বরং স্ত্রীর সম্মান কি করে রক্ষা করা যায় সেটাকেই ফার্স্ট প্রায়োরিটি ভেবেছেন তিনি। স্মিথ কি ভুল? যদিও একদল এর মতে এমন একটি মঞ্চে এই ধরনের সিনক্রিয়েট করা উচিত হয়নি। কিন্তু যে মানুষটার ভালোবাসার ব্যক্তিটিকে নিয়ে এভাবে মজা করা হল, সেকি সত্যিই সিনটা ক্রিয়েট করল? তাহলে আপনি সমাজটাকে সুস্থ রাখতে যদি একটা ছোট্ট প্রতিবাদ করেন, ক্ষতি কি বলুন তো? না, তা বলে একেবারে প্রাণ হাতে নিয়ে প্রতিবাদ করতে হবে তা নয়। মুখের কথাটুকু তো বলা যায়। কে জানে আপনাকে দেখে হয়তো আর পাঁচজন এগিয়ে এল। আপনারা পাঁচ থেকে পঞ্চাশ হলেন। সমস্ত দুষ্টু থেকে সুস্থ হল। সত্যিই কি এতে কোনও ক্ষতি আছে? যে মানুষগুলো অন্যের খোরাক করে হাসায়, তার কথা হাসতে ইচ্ছে করে? আপনিও যদি আজ খোরাক হয়ে যান। নিজের উপর হাসতে পারবেন তো? প্রশ্ন করুন, ভাবুন। ভাবলে পরিবর্তনটা ঠিকই আসবে। হয়তো সমাজে এক্ষুনি আসবে না, তবে আপনার মধ্যে আসবে। একবার না হয় ঘুরে দাঁড়ানো যাক। নিজের ত্রুটিগুলো বিবেচনা করা হোক। যে ত্রুটি গুলো দেখে আজকে হাসছেন, কে বলতে পারে সেগুলো আপনার মধ্যেই রয়েছে হয়তো। নিজেকে পড়ুন। যার সম্পর্কের হাসাহাসি করছেন, তার মানসিক পরিস্থিতিটা জানার চেষ্টা করুন। হয়তো কেউ ভাবতেও পারবে না, যে কষ্টের মধ্যে ওই মানুষটা রয়েছে আপনি থাকলে হয়তো বাঁচতে পারতেন না। একটা কথা মাথায় রাখতে হবে, আঙ্গুল একজনের দিকে তুললে পাখি তিনটে কিন্তু নিজের দিকেই ওঠে। ব্যঙ্গ, রসিকতা এসব করার বিষয়ে অভাব নেই। মানুষকে হাসানো সবচেয়ে কঠিন কাজ। দুঃখ দিতে না নয় সবাই পারে। তবে অন্যকে ছোট করে হাসানোটা কোনও শিল্প নয়। ওটা নিজের শিক্ষাগত যোগ্যতার ফলে গড়ে ওঠা ব্যক্তিত্বের পরিচয় মাত্র। জন্ম থেকে কেউ এসব নিয়ে আসে না। পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি থেকেই সংগ্রহ করে করে নিজেকে খারাপ করে তোলে। ঠিকভাবে যদি খোঁজা যায় তবে ভালো করার সামগ্রীও আশেপাশেই ছড়িয়ে রয়েছে। প্রথম প্রথম হাতরে বেড়ালেও পরের দিকে খুঁজতে অসুবিধে হবে না। আসলে যারা অন্যকে ছোট করে কথা বলতে পারে তারা নিজেকেও কোনওদিন ভালোবাসেনি। কারণ ভালোবাসলে একটা মানুষ নিজেকে খারাপ হতে দেয় না। নিয়ন্ত্রণ করে ভালোর মধ্যে বেঁধে রাখার চেষ্টা করে। গৌতম বুদ্ধ বলেছিলেন, আপনার শত্রুর চেয়ে ক্ষতি আপনিটার মধ্যে থেকে যাওয়া খারাপ চিন্তাগুলোই করছে। তাই অন্যকে দোষারোপ করার আগে নিজেকে ঠিক করতে হবে। নিজে ঠিক থাকলেও প্রতিবাদের ভাষা স্পষ্টভাবে ফুটে উঠবে সমাজে। ভবিষ্যতে। যে মানুষগুলো অন্যকে খারাপ বলছে, তাদের নিজেদের জীবনের অবস্থান স্পষ্ট নয়। কাজ থাকলে কী কেউ এসব করে? সুস্থ সমাজ ব্যবস্থা এটা কোনওদিনই হতে পারে না। কিন্তু একাংশের সমর্থনেই এরা উচ্চস্থানে বসে রয়েছে। এলাহী জীবনযাপন করছে। সকলকে বুঝতে হবে, জানতে হবে। তফাৎ করতে শিখতে হবে অসভ্যতা আর রসিকতার। অধিকার আর ঔদ্ধত্যর।

আরও পড়ুন:  কলকাতার বুকে অমূল্য রতন

Featured article