20 C
Kolkata

স্বার্থক পিয়ালীর স্বপ্ন

সুদীপ্ত ভট্টাচার্যঃ ছোটবেলায় বাবা-মায়ের হাত ধরে সেই ছোট্ট মেয়েটি নেপালের মাটি থেকে দেখেছিল বিশ্বের মাউন্ট কিলার হিসেবে যার নাম উঠে আসে সবার আগে সেই অন্নপূর্ণাকে। তারপর থেকেই পাহাড়ের সঙ্গে তাঁর গভীর ভালোবাসার জন্ম। সেই দিন থেকেই সে মনে মনে স্থির করেছিল পাহাড় তোমার সঙ্গে আমার এই ভালবাসা আজ থেকে আরও গভীর হল। কিন্তু তোমার সামনে থেকে প্রতিজ্ঞা করলাম একদিন না একদিন তোমার শৃঙ্গ জয় আমি করবোই। সেই স্বপ্ন দেখা শুরু করলাম আজ থেকে।

চন্দননগরের কাঁটাপুকুরের সেই তরুণী হলেন পিয়ালী বসাক। ছোট্টবেলায় পড়াশোনার পাশাপাশি বাবা-মার্ সঙ্গে নেপালে পাহাড় দেখতে যাওয়ার পরই পাহাড় আহরণের স্বপ্নের বীজ নিজের মনে বোপন করতে থাকে সে। তারপর একে একে মাউন্টিয়ারিং কোর্স কমপ্লিট করে পিয়ালী যোগ দেন প্রাথমিক শিক্ষকের চাকরিতে। মেয়ের সরকারি চাকরিতে বসাক পরিবারে ফিরে আসে কিছুটা স্বচ্ছলতা। কিন্তু এরপরও নিজের পাহাড়ের শৃঙ্গ জয় করার স্বপ্ন দেখা থেকে একটি বিন্দুও সরে আসেননি শিক্ষিকা পিয়ালী।

মাঝে মধ্যে স্কুলে ছুটি নিয়েই ছোট ছোট শৃঙ্গ জয় করতে থাকেন পিয়ালী। এর পর সে স্বপ্ন দেখা শুরু করে বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গের শিখর স্পর্শ করার। কিন্তু এভারেস্টের চূড়ায় ওঠার স্বপ্ন অনেকে দেখলেও, খুব কম সংখ্যক পর্বতারোহীরই এই কঠিন স্বপ্ন বাস্তবে রূপ পায়। কেননা সাগরমাথার চূড়ায় উঠতে গেলে তো লাগে বিপুল পরিমাণ অর্থ, কঠোর পরিশ্রম আর সবশেষে লাগে প্রকৃতির আশীর্বাদ।

আরও পড়ুন:  প্রয়াত ইস্টবেঙ্গলের ৭০ -এর আইএফএ শিল্ড জয়ের নায়ক পরিমল দে

না, এত প্রতিবন্ধকতাও দমিয়ে রাখতে পারেনি পিয়ালীকে। মাউন্ট এভারেস্টের চূড়ায় তাঁর পদচিহ্ন সে রাখবেই। এই চ্যালেঞ্জকেই বেছে নিয়ে এগিয়ে চলে সে। ২৩ মে ২০১৯ সাগরমাথার হিলারি স্টেপে সাত সকালেই পৌঁছে গিয়েও ফিরে আসতে হয়েছিল তাঁকে। সূর্যের আলোয় মাউন্ট এভারেস্টের চূড়ায় তখন ভিড় পর্বতারোহীদের। বাদ শুধু পিয়ালী। সেই দিন এভারেস্টের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে পিয়ালী প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, আজ ব্যর্থ হয়ে ফিরে যাচ্ছি ঠিকই কিন্তু একদিন না একদিন শৃঙ্গ জয় আমি করবই।

২০২১। সেপ্টেম্বর মাস। পিয়ালী আবার বেড়িয়ে পড়লেন পর্বতের শিখর ছুঁতে। তবে এবার তাঁর লক্ষ্য এভারেস্ট নয়। বিপদের দিকে থেকে এভারেস্টকেও পিছনে ফেলা ধৌলাগিরি। যে পর্বতের শৃঙ্গ আহরণ করতে গিয়েই মৃত্যুর কোলে ঢোলে পড়েছেন রাজীব ভট্টাচার্য। যে ধৌলগিড়ি শৃঙ্গ জয় করতে গিয়েই মৃত্যুর খুব কাছ থেকে ফিরে এসেছিলেন বসন্ত সিংহ রায় ও দেবাশীষ বিশ্বাসরা।

Dhaulagiri (8167 m)

এবার পাহাড় পিয়ালীকে ফিরিয়ে দেয়নি। বরঞ্চ বিপদের দিকে থেকে সাত নম্বরে থাকা ধৌলগিরি হার মেনেছে চন্দননগরের এই পর্বতারোহীর কাছে। কোনও অক্সিজেন সিলিন্ডার ছাড়াই পিয়ালী জয় করেছেন ধৌলগিরির শৃঙ্গ। এটাও একটি রেকর্ড। সেই ধৌলগিরি জয় করে রবিবার শহরে ফিরলেন পিয়ালী। ফোনে তাঁর সঙ্গে যখন যোগাযোগ করলাম সে সেই সময় সবেমাত্র বাড়ি ফিরেছে সে । ক্লান্ত অবসন্ন শরীর নিয়েই পিয়ালী বললেন, সেই ৫ বছর বয়সে দেখা আমার সেই স্বপ্ন এতদিনে সফল হল। আমি সবাইকে ধন্যবাদ জানাই আমার পাশে থাকার জন্য। কিন্ত অক্সিজেন ছাড়াই এই শৃঙ্গ জয় করলেন কিভাবে? প্রশ্নটি শুনে পিয়ালী বলেন, পাহাড়ে গেলে উচ্চতার অনেকের ওক্সিজেন সিলিন্ডার লাগলেও আমার লাগে না। আমি ওই উচচতায় গেলে মনে বাড়তি জোর পাই। তবে কি জানেন, এবারও আবহাওয়া খুবই খারাপ ছিল। তবুও আমি হেরে যাইনি। ধৌলাগিরির শৃঙ্গ জয় করেই ছেড়েছি। এটা আমার কাছে একটা বাড়তি পাওনা।

আরও পড়ুন:  তিলোত্তমায় পা রাখতেই সংবর্ধনা দুই বঙ্গ কন্যাকে

পিয়ালী আপনি পেরেছন এই মৃত্যুমুখী এই কঠিন চ্যালেঞ্জকে জয় করতে। যে চ্যালেঞ্জ নিতে গিয়েই কাঞ্চনজঙ্ঘার তুষারে মোড়া চাদরে চিরতরে ঘুমিয়ে আছে ছন্দা গায়েন।

Featured article

%d bloggers like this: